নির্জন কারাবাসের অবর্ণনীয় যন্ত্রণার কিছু অভিজ্ঞতা

০৩ এপ্রিল,২০২১

নির্জন কারাবাসের অবর্ণনীয় যন্ত্রণার কিছু অভিজ্ঞতা

নিউজ ডেস্ক
আরটিএনএন
ঢাকা: ম্যান্ডেলা রুলস নামে জাতিসংঘের এক প্রস্তাবে দীর্ঘ সময়ের নির্জন কারাবাসকে নির্যাতন হিসাবে বর্ণনা করে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ছয় বছর আগের সেই প্রস্তাব অনুসরণ করে এতদিন পর যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রথম নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য আইন করে ১৫ দিনের বেশি নির্জন কারাবাস নিষিদ্ধ করেছে।

একবার ভাবুন আপনি একেবারে ছোট একটি কারাকক্ষে একদম একা বছরের পর বছর থাকছেন যেখানে মাঝেমধ্যে আশপাশের এমন কক্ষ থেকে মানসিক ভারসাম্য হারানো কয়েদিদের চিৎকার ভেসে আসছে। কতটা দুর্বিসহ হতে পারে এমন জীবন?

কিন্তু এখনও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কারাগারে অনির্দিষ্টকালের জন্য এমন নির্জন কারাবাসের বিধান কার্যকর।

ছোট একটি কারাকক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন একাকী কারাভোগের যন্ত্রণার কথা বলেছেন কয়েজন সাবেক কয়েদি

ক্যান্ডি হেইলি
দুই সন্তানের মা ক্যান্ডি হেইলিকে নারকীয় এই অভিজ্ঞতা ভোগ করতে হয়েছে। হত্যার চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর ২০১২ সালে তাকে পাঠানো হয় নিউইয়র্কের রাইকার আইল্যান্ড কারাগারে, যদিও পরে তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।

নিরজন কারাকক্ষে ঢোকার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হেইলি বলেন, আমার মনে হয়েছিল আমি যেন নরকে ঢুকলাম। কারাকক্ষটি ছিল একটি এলিভেটরের মাপে যেখানে আপনি ২৪ ঘণ্টা আটকে রয়েছেন।

রাইকার কারাগারে তার বিরুদ্ধে নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ এনে তাকে তিন বছর নির্জন কারাকক্ষে রাখা হয়েছিল।

হেইলি সেখানে কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তার কব্জিতে এখনো সেই নিশানা রয়েছে।

তিনি বলেন, আপনার মাথায় শুধু আত্মত্যার চিন্তা ঘুরবে। আমি ঘুমের বড়ি খেয়েছিলাম। কব্জি কেটেছি।

করোনাভাইরাস প্যানডেমিকের আগে আমেরিকায় এমন নির্জন কারাকক্ষে কয়েদির সংখ্যা ছিল ৬০ হাজারেরও বেশি। প্যানডেমিকের পর তা বহুগুণে বেড়েছে। কারণ অনেক কারা কর্তৃপক্ষ কয়েদিদের যতটা সম্ভব স্থানান্তর না করার চেষ্টা করছে।

সাধারণ কয়েদিদের নিরাপদ রাখার জন্য বিশ্বের অনেক দেশেই বিপজ্জনক এবং হিংস্র ধরনের কয়েদিদের অন্যদের থেকে পৃথক করে সাময়িকভাবে একাকী নির্জন কারাকক্ষে রাখা হয়। কিন্তু আমেরিকাতে এই পদ্ধতির প্রয়োগ অনেক বেশি।

এমনকি মানসিকভাবে বেসামাল কয়েদিদেরও ছোটোখাটো নিয়মভঙ্গের দায়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য এই শাস্তি দেয়া হয়।

উনিশশো আশীর দশকে আমেরিকাতে এই ব্যবস্থাকে বিপজ্জনক বলে গণ্য করা শুরু হরেও ১৯৮৩ সালে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ম্যারিওনে কয়েদিদের হাতে দুজন কারারক্ষীর মারা যাওয়ার ঘটনার পর নতুন করে এই নির্জন কারাবাসের ব্যাপক প্রয়োগ শুরু হয়।

নিউইয়র্ক সিটি কারা কর্তৃপক্ষের সাবেক মেডিকেল অফিসার হোমার ভেন্টারস বলেন, হাজার হাজার কয়েদিকে বছরের বছরের পর বছর ধরে এরকম নির্জন কারাকক্ষে রাখা হয়। এমন নির্জন কারাবাসের ফলে ভয়াবহ মানসিক ব্যাধি হতে পারে - এমন শক্ত প্রমাণ পাওয়া স্বত্বেও এমন ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে।

আমি এমন অনেক রোগী পেয়েছি যারা এমন নির্জন কারাকক্ষে থাকার কিছুদিনের মধ্যে বলতেন তারা অশরীরী কাউকে দেখতে পান, অদ্ভুত আওয়াজ পান।

এর কারণ মানুষের মৌলিক যেসব আচরণ - অন্যের সাথে কথা বলা, আদান-প্রদান বা সময় দিনক্ষণ জানা - এসব থেকেও তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়।

বিলি ব্লেক
হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত বিলি ব্লেককে নিউ ইয়র্কের একটি কারাগারে ৩৪ বছর ধরে ছোটে একটি কক্ষে একাকী রাখা হয়েছিল।

তিনি বলেন, তার আশেপাশের কক্ষে এ ধরণের কয়েদিরা রাতভর চিৎকার করতো, দরজা ধাক্কাতে থাকতো। নিজের বিষ্ঠা ছোঁড়াছুঁড়ি করতো।

বিলি ব্লেক বলেন, তিনি নিজে যেন এমন পাগল না হয়ে যান তার জন্য সবসময় সচেতনভাবে চেষ্টা করতেন। নিজের মনের সাথে লড়াই করতেন। আমি দেখেছি অনেক কয়েদি নিজের কক্ষের মধ্যে মল-মূত্র ত্যাগ করে তা ছড়াচ্ছে। আমি ভাবতাম আমার যেন এই পরিণতি কখনো না হয়।

আমেরিকাতে কোন কয়েদিকে নির্জন কারাবাসে পাঠানো হবে এবং সেই শাস্তির মেয়াদ কতদিন হবে সে সিদ্ধান্ত আদালত নেয়না, বরঞ্চ সেটি নেয় সংশ্লিষ্ট কারাগার কর্তৃপক্ষ।

অনেক ক্ষেত্রেই সেই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে একজন কয়েদি মানসিকভাবে সুস্থ থাকবে বা থাকবেনা। অনেক সময় তার জীবন বা মৃত্যুও নির্ভর করে কারা কর্তৃপক্ষের ঐ সিদ্ধান্তের ওপর।

বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা সাধারণ কয়েদিদের তুলনায় এমন নির্জন কারাবাসে পাঠানো কয়েদিদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা ছয়গুণ বেশি। এমনকি মুক্তির পর এক বছর পর্যন্ত তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে।

যেমন ক্যান্ডি হ্যালি মুক্তি পাওয়ার ছয় বছর পর তার নানারকম মানসিক অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এখনও তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা কাজ করে। তিনি বলেন, আমি যদি কখনো আত্মহত্যা করি, তার কারণ হবে আমার নির্জন কারাবাস।

ক্যান্ডি হ্যালি অভিযোগ করেন একাকী নির্জন সেলে থাকার সময় তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। এরকম একাকী আটক রাখা কয়েদিদের ওপর নানারকম নির্যাতনের জন্য কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ পাওয়া যায়।

রাইকার আইল্যান্ড কারা কর্তৃপক্ষ মিস হেইলির বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজী হয়নি।

কিশোরের আত্মহত্যা
নির্জন কারাবাস যদি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকেও এমন বিপর্যস্ত করে ফেলতে পারে, তাহলে শিশুদের ওপর তার প্রভাব কী হয়?

তের বছরের সোলান পিটারসন ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একদিন লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যে স্রেবপোর্টে তার স্কুলের ময়লার বিনে আগুন দিয়েছিল। সেই অপরাধে তাকে ধরে কিশোর অপরাধীদের জন্য তৈরি একটি আটকে কেন্দ্রে নিয়ে রাখা হয়। সেখানে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে তাকে কেন্দ্রের একটি নির্জন কারাকক্ষে ভরে রাখা হয়।

কয়েকদিন পর তার বাবা রনি পিটারসনকে ছেলের সাথে দেখা করতে দেয়া হয়।

পিটারসন বলেন, দরজায় চার ইঞ্চি একটি ফুটো দিয়ে আমি তার সাথে কথা বলতে পারি। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম এভাবে একদম একা ফেলে রাখার কারণে সে একেবারে ভেঙ্গে পড়েছে। দেয়ালে একের পর এক ঘুষি মারছিল।

টানা পাঁচদিন এরকম নির্জন সেলের ভেতর থাকার পর ১৩ বছরের সোলান পিটারসন কারাগারে আত্মহত্যা করে।

পিটারসন বলেন, রাত দুটোর সময় আমাকে টেলিফোন করে জানানো হয়, আমার ছেলে মারা গেছে। আমি পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। আমি কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি সে আত্মহত্যা করতে পারে। স্বাভাবিক একটি কিশোর ছিল সে।

অতি সম্প্রতি আমেরিকাতে নির্জন কারাবাসের নিয়মে খুব ধীরে হরেও কিছু সংস্কার আনা হচ্ছে। যেমন, নিউইয়র্ক রাজ্যে আইন করে ১৫ দিনের বেশি নির্জন কারাবাস নিষিদ্ধ হয়েছে, যদিও এই আইন এক বছর পর্যন্ত কার্যকরী হবেনা।

তাছাড়া, রাজ্যের গভর্নর ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি এই আইনে কিছু পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত। নিউইয়র্ক সিটিতে ২২ বছরের কম বয়সীদের নির্জন কারাবাস নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু কিশোর আটক কেন্দ্রের কারারক্ষীরা এর বিরোধিতা করছে। তাদের যুক্তি এর ফলে কারাগারের মধ্যে সহিংসতা বেড়ে যাবে।

মন্তব্য

মতামত দিন

জাতীয় পাতার আরো খবর

পুলিশ প্রধান ও র‍্যাব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অর্থ কী

নিজস্ব প্রতিবেদকআরটিএনএনঢাকা: গুরুতর মানবাধিকার লংঘনমূলক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশের পুলিশের এলিট ফোর্স র‍্য . . . বিস্তারিত

কোনো নিয়মেই থামছে না ঘরমুখী মানুষের স্রোত

নিজস্ব প্রতিনিধিআরটিএনএনমুন্সীগঞ্জ: কোনো আইন-কানুনই আটকাতে পারছে না শিমুলিয়ার জনস্রোত। প্রশাসনের সকল কৌশল টপকিয়ে যাত্রীদ . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 

ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com