শ্রীলঙ্কা সংকট পালাচ্ছে দক্ষ জনশক্তি

২২ আগস্ট,২০২২

শ্রীলঙ্কা সংকট পালাচ্ছে দক্ষ জনশক্তি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আরটিএনএন
ঢাকা: শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো ভিত্তিক একজন বিনিয়োগ গবেষক সালমা ইউসুফ। তিন বছরের এক ছেলেসন্তান ও কাপড়চোপড়ে ঠাসা একটি সুটকেসকে সঙ্গী করে শ্রীলঙ্কা ছেড়েছেন। পাড়ি দিয়েছেন দুবাইয়ে। সেখানে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। এর কারণ, দেশের অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা। জুনে তিনি দেশ ছেড়েছেন। দুবাইয়ে তার স্বামীর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। সেখানে তার স্বামী একজন সেলস ও মার্কেটিং ডিরেক্টর হিসেবে একটি কাজ নিশ্চিত করেছেন।

এ খবর দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে- সাত দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছে শ্রীলঙ্কা।

এর ফলে হাজার হাজার পেশাদার কর্মজীবী দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন। সালমা তাদের একজন। কি পরিমাণ মানুষ শ্রীলঙ্কা ছেড়েছেন তার প্রকৃত কোনো সংখ্যা নেই। কিন্তু প্রাথমিক ভিত্তিতে এবং ব্যবসায়ী নেতাদের দেয়া তথ্যে যে পরিমাণ মানুষকে দেশ ছাড়তে দেখা যাচ্ছে তা দেশটির ক্ষতির জন্য যথেষ্ট। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হলেও এই ব্রেইন ড্রেইন থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। সালমা ইউসুফ তাদের অন্যতম। তিনি বা তারা জানেন না আর কখনো দেশে ফিরবেন কিনা। ৩০ বছর বয়সী সালমা বলেছেন, দেশ ছাড়ার বিষয়ে আমার স্বামীকে রাজি করাতে অনেক সময় লেগেছে। কারণ সে চেয়েছে দেশটাতে থাকতে এবং দেশকে ভালোবাসতে।

কিন্তু মার্চে শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। রাজনৈতিক প্রতিবাদ সমাবেশে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে দেশ। এতে প্রতিদিন জীবন চালানো কঠিন হয়ে ওঠে। সালমা বলেন, এ সময় আমরা অনুধাবন করতে পারি, যদি শিগগিরই দেশ ছেড়ে না যাই তাহলে ভয়াবহ এক কঠিন পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। তিউনিশিয়া থেকে হাইতি। হাইতি থেকে পাকিস্তান- সর্বত্র আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি। এর ফলে বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যে নিপতিত হচ্ছে। দেখা দিচ্ছে প্রতিবাদ বিক্ষোভ, অসন্তোষ। এমনকি ধনী দেশগুলো বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। তারা কৃচ্ছ্রতাসাধন করছে। মার্চ থেকে শ্রীলঙ্কানরা ভয়াবহ জ্বালানি এবং রান্নার গ্যাসের সংকটে ভুগতে শুরু করে। দ্রুত সেখানে ফুরিয়ে যেতে থাকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ওষুধ, খাদ্য এমনকি গুঁড়োদুধের সরবরাহ ফুরিয়ে যেতে থাকে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অসন্তোষ ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে।

জুলাই থেকে স্বাস্থ্যসেবা এবং কৃষি কাজের মতো অত্যাবশ্যকীয় সার্ভিসের জন্য শুধু জ্বালানি দেয়া হয়। খাবারের মূল্য বাড়তেই থাকে। জুলাইয়ে বছরের সঙ্গে বছরের তুলনায় খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় শতকরা কমপক্ষে ৯০ ভাগ। অর্থাৎ খাবারের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ভোক্তাদের মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় শতকরা ৬০.৮ ভাগ। এমন এক কঠিন অবস্থায় পড়ে দেশ ছেড়ে যাওয়া অভিবাসীরা বলেন, তারা সরকারের ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদ নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। তাতে মধ্যবিত্তরাও দলবদ্ধ হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হবেন। বর্তমানে উন্নত জীবনের আশায় যারা দেশ ছাড়ছেন তার মধ্যে বেশির ভাগই দক্ষ পেশাদার। এর মধ্যে আছেন ডাক্তার, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানী। এর ফলে মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা। দুই কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশটি এর ফলে নতুন পৃথিবীতে দক্ষতায় উদ্বেগজনকভাবে পিছিয়ে পড়বে। ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের মাইগ্রেশন অ্যান্ড আরবানাইজেশন পলিসি রিসার্সের প্রধান ড. বিলেশা বীরারত্নে বলেন, দক্ষ জনশক্তির দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এক উদ্বেগজনক প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে।

২০২০ এবং ২০২১ সালের প্রথম ৬ মাসে যথাক্রমে ৪০,৫৮১ এবং ৩০,৭৯৭ জন মানুষ অভিবাসী হয়েছেন। কিন্তু ২০২২ সালের প্রথম ৬ মাসে নিবন্ধিত এমন সংখ্যা প্রায় ১,১৩,১৪০। এ তথ্য বিলেশা বীরারত্নের। তবে এ বিষয়ে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই। এ বিষয়ে বার বার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে অভিবাসন বিষয়ক অফিস। কিন্তু পাসপোর্ট অফিসের বাইরে এখন দীর্ঘ লাইন দৃশ্যমান। এ বছরের প্রথম ৫ মাসে শ্রীলঙ্কা ইস্যু করেছে ২,৮৮,৬৪৫টি পাসপোর্ট। আগের বছরে একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৯১,৩৩১টি। এ তথ্য সরকারি।

দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখা: লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ, কোয়ান্টা এয়ারওয়েজ অথবা বোয়িংয়ের মতো বিদেশি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সাপোর্ট সার্ভিস দিয়ে থাকে যেসব আইটি কোম্পানি তারা মেধাবীদের ধরে রাখার জন্য স্থানীয় বেতন পরিশোধে বিদেশি মুদ্রা ব্যবহার করছে। এমন আউটসোর্সিং সার্ভিস দেয়া হয় বেশির ভাগই প্রযুক্তি খাতে। এটিই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। কিন্তু বেতন পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার কোনো পরিবর্তন আনতে পারছে না। এ কথা বলেছেন এর সঙ্গে জড়িত নেতৃস্থানীয়রা। ডব্লিউএসও২ হলো কলম্বোভিত্তিক সফটওয়্যার বিষয়ক প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে কাজ করেন ৮৫০ জন ফুলটাইম কর্মী। এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জীব বীরাওয়ারানা বলেন, এ বছর তার কোম্পানি শতকরা প্রায় ১০ ভাগ কর্মশক্তি হারিয়েছে। কারণ, কর্মীরা কাজের জন্য বা পড়াশোনার জন্য দেশ ছেড়েছেন। তিনি বলেন, যখন আমরা কর্মীদের কাছে জানতে চাইলাম তাদের কে কে বিদেশে যেতে চান। তাদের অর্ধেকের বেশিই বললেন বিদেশে যেতে চান। এতে কী প্রভাব পড়ে তা আগামী ৬ মাসে আমরা জানতে পারবো। ওদিকে অধিক রেমিট্যান্স আয় করার লক্ষ্যে জুনে সরকার চালু করেছে ‘ওয়ার্ক এবরোড’ কর্মসূচি। এই কর্মসূচিতে সরকারি কর্মীদেরকে বিনা বেতনে ৫ বছর বিদেশে থাকার অনুমতি দেয়া হচ্ছে। এর ফলে সরকার কিছু বাড়তি রেমিট্যান্স পাচ্ছে।

জ্বালানির সংকট থেকে অর্থনীতির দুরবস্থা দীর্ঘায়িত হয়েছে। যেসব দক্ষ পেশাদার দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন তারা বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণ প্রতিদিন বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মুক্তভাবে চলাচলের স্বাধীনতা হারানো। মার্চে বিদ্যুৎ বিভ্রাট কোনো কোনো সময় অর্ধদিবস পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছে। সালমা ইউসুফ বলেন, আমি আতঙ্কের সঙ্গে লড়ছিলাম। হতাশা পেয়ে বসেছিল আমাকে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সঙ্গে আমার কাজের শিডিউল মিলিয়ে পরিকল্পনা করতে হতো। যখন আমার শিডিউলের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নকরণ মিলতো না, আমি ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তাম। এতে মনমেজাজ বিগড়ে যেতো। এরপর ছেলের স্কুল জীবনে যেন শর্টসার্কিট হলো। পরিবহনে সংকট। এ জন্য আমার ছেলেকে বিশ্রামহীন থাকতে হতো। সে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিল। কলম্বোভিত্তিক একটি হাসপাতালের চিকিৎসক নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তিনি বলেছেন, নার্স ও ডাক্তার সহ অনেক সহকর্মী এ বছর এরই মধ্যে বিদেশে চলে গেছেন। আরও অনেকে সেই পথ অনুসরণ করতে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতের এসব স্টাফকে প্রশিক্ষিত করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। বিশেষ করে সার্জারি এবং ইমার্জেন্সি খাতে। মেডিকেল স্টাফরা এভাবে বিদেশমুখী হলে তাতে দেশের স্বাস্থ্যখাতের গুণগত মানের ওপর বড় রকম ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে।

দেশবাসীর এই দেশত্যাগের জন্য শুধু অর্থনৈতিক হতাশাই নয় এর সঙ্গে আরও অনেক ফ্যাক্টর জড়িত। অক্টোবরে বৃটেন চলে যাচ্ছেন ৩১ বছর বয়সী একজন সমতা বিষয়ক গবেষণা বিশ্লেষক। তিনি কলম্বোর বাসিন্দা। তিনি একজন মুসলিম। বলেন, জনগণ আশা হারিয়ে ফেলেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারে ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের আশা নেই। আমরা আবারো সেই সব রাজনীতিকদের ভোট দিতে যাচ্ছি। কারণ, দেশে জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে। সালমা ইউসুফ বলেছেন, দেশকে বিদায় জানানোটা তার জন্য কঠিন ছিল। বলেন, শ্রীলঙ্কায় ফ্রি শিক্ষা ব্যবস্থার একজন উপকারভোগী আমি। এখন দেশ ছেড়ে যেতে খুব খারাপ লেগেছে। কিন্তু দেশে আমার অর্থনৈতিক অবস্থা যা, তাতে জীবন চালাতে পারছি না। যদি দেশে থাকি, তাহলে জানি না আমার ছেলে শিক্ষায় একই গুণগত মান পাবে কিনা। এ জন্যই আমাকে কঠিনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, আমাদের সন্তানের উন্নত জীবনের জন্য।

মন্তব্য

মতামত দিন

এশিয়া পাতার আরো খবর

তালেবান নিষেধাজ্ঞাকে ‘বুড়ো আঙুল’ দেখাচ্ছে আফগান মেয়েরা

আন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনঢাকা: তালেবান দ্বিতীয় দফায় আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের প্রায় আড়াই মাস পেরিয়ে যাচ্ছে। প্রথম দফার . . . বিস্তারিত

ন্যাটোকে পাল্টা হুঁশিয়ারি চীনের

আন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনঢাকা: সম্প্রতি বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে একদিনের ন্যাটো সম্মেলনে বেইজিংয়ের সামরিক তৎপরতা নিয় . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 

ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com